পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার দিঘা ও বাঁকিপুট উপকূল এলাকায় দুই নতুন প্রজাতির সামুদ্রিক কেঁচোর সন্ধান মিলেছে। এই আবিষ্কার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (জেডএসআই) এসচুয়ারিন বায়োলজি রিজিওনাল সেন্টার এবং মেক্সিকোর সিআইসিইএসই-এর সামুদ্রিক পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষকরা যৌথভাবে এই অনুসন্ধান চালান। নতুন আবিষ্কৃত দুটি প্রজাতিই অ্যানিলিডা পর্বের অন্তর্গত এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত উপকূলীয় অঞ্চলে এদের আবাসস্থল।
নামালিকাস্টিস সোলেনোটোগনাথা: নালিচোয়াল বিরল প্রজাতি
প্রথম প্রজাতিটির নামকরণ করা হয়েছে নামালিকাস্টিস সোলেনোটোগনাথা। গ্রিক শব্দ সোলেনোটোস (নালি) ও গ্নাথা (চোয়াল) থেকে এই নামের উৎপত্তি। এই প্রজাতির কেঁচোর চোয়ালে একাধিক সূক্ষ্ম নালি রয়েছে, যা একে অন্যান্য প্রজাতি থেকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করে।
এই প্রজাতি প্রধানত উন্মুক্ত কাদামাটির চর এলাকায় বাস করে। এরা অত্যন্ত দূষণ সহনশীল। সালফাইড-সমৃদ্ধ দুর্গন্ধযুক্ত এবং জৈব পদার্থে ভরা পলিতেও এরা সহজেই টিকে থাকতে পারে। পচনশীল ম্যানগ্রোভ কাঠ, গাছের বাকল, নারকেলের ছোবড়া এবং শক্ত কাদামাটির মধ্যেই এদের বেশি দেখা গিয়েছে।
নেরেইস ধৃতিআই: বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি
দ্বিতীয় প্রজাতিটির নামকরণ করা হয়েছে নেরেইস ধৃতিআই। জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রথম মহিলা অধিকর্তা ড. ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মানে এই নামকরণ। প্রাণী শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই নামকরণ।
এই প্রজাতির কেঁচো প্রধানত বালুকাবেলায় কাঠের ডক পাইলের মধ্যে বাস করে। জোয়ারের সময় এই এলাকা সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে যায়। গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা এই প্রজাতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
উপকূলীয় পরিবেশ পর্যবেক্ষণে নতুন দিশা
গবেষক দলের সদস্য জেডএসআই-এর জ্যোৎস্না প্রধান, ড. অনিল মহাপাত্র এবং মেক্সিকোর ড. তুলিও এফ. ভিলালোবস-গুয়েরেরো জানিয়েছেন, নতুন আবিষ্কৃত এই প্রজাতিগুলি এমন উপকূলীয় অঞ্চলে পাওয়া গেছে যা মানুষের কার্যকলাপ এবং দূষণের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। এই কারণেই ভবিষ্যতে এগুলি উপকূলীয় পরিবেশ পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ বায়ো-ইন্ডিকেটর (জৈব নির্দেশক) হিসেবে কাজ করতে পারে বলে গবেষকরা মনে করছেন। তবে এই বিষয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এই আবিষ্কার আবারও প্রমাণ করল, ভারতের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হটস্পট। গবেষকদের মতে, উত্তর বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার এক নতুন দিশা খুলে দিয়েছে।





